বিরিয়ানির হাঁড়ি লাল কাপড় দিয়ে কেনো ঢাকা থাকে জানেন? জেনে নিন কারনটি

জানেন কেন শুধু লাল কাপড় দিয়েই মোড়া থাকে বিরিয়ানির হাঁড়ি? কারণ জানলে অবাক হবেন

বিরিয়ানিকে যতই অওধি বা মোঘলাই খাবারের তালিকায় ধরুন না কেন, রসনাপ্রিয় বাঙালির হেঁশেলে বেশ অনেকদিন আগেই ঢুকে প্রেছে এই জনপ্রিয় খাবারটি। বেশির ভাগ বাঙালিই বিরিয়ানিকে এখন প্রথম প্রেম বলে মানে। শুধু বাঙালিই নয়, স্বাদ আর গন্ধ দিয়ে বিরিয়ানি মন জয় করে নিয়েছে বহু জাতির। এমনকি, বিরিয়ানির মোহতে পড়া থেকে বাদ যান নি নিরামিষভোজীরাও। মটন বিরিয়ানি, চিকেন বিরিয়ানি, ডিম বিরিয়ানি, আলু বিরিয়ানি বা পনির দেওয়া ভেজ বিরিয়ানি – কতই না বিরিয়ানির প্রকারভেদ।

রোজকার খাবার তালিকায় না থাকলেও, আমরা প্রায় প্রত্যেকেই বলতে গেলে বেশ ঘন ঘনই ঢুঁ মেরে আসি বিরিয়ানির দোকানে। করোনাকালে বেশীরভাগ প্রায় সব হোটেল, রেস্তোরাঁ ও খাবার দোকান বন্ধ থাকলেও বাদ যায় নি বিরিয়ানি খাওয়া। ইন্টারনেট ঘেঁটে রেসিপি জোগাড় করে বাড়িতে নিজের মতো করে বানিয়ে নিয়েই খেয়েছি এই মোগলাই খানা।

কিন্তু জানেন, বিরিয়ানি প্রথম পাওয়া যেত শুধু দিল্লি আর লখনৌতে তাও শুধু সেইসব হোটেল বা রেস্তোরাঁয় যাদের বিশেষত্ব হল বিভিন্ন মোঘলাই খানা। আর এখন, গ্রাম থেকে মফঃস্বল কিংবা বড় বড় শহর সর্বত্র রাস্তার আনাচে-কানাচে, অলিতে-গলিতে বিরিয়ানির দোকান দেখা যায়। সাধ্যের মধ্যে স্বাদ পূরণ করতে বিরিয়ানির হাঁড়ি নিয়ে হাজির ছোট থেকে বড় হোটেল অথবা রেস্তোরাঁ।

দোকানের পাশ দিয়ে যাবার সময় গন্ধে যেন পা আটকে যায় সেইখানেই। একটা বিরাট বড় হাঁড়ি, আর তার গায়ে জড়ানো একটা লাল কাপড় আর তাকে উপেক্ষা করে এমন সাধ্য আছে কার?  তবে, কোনও দিন কি ভেবে দেখেছেন যে বিরিয়ানির হাঁড়িতে কেন শুধু লাল কাপড়ই জড়ানো হয়? যদি কাপড় জড়িয়ে রাখাই মূল উদ্দেশ্য হত তবে সাদা, কালো, নীল, সবুজ বা হলুদ যে কোনো রঙের কাপড়ই ব্যবহার করা হত। কিন্তু সব জায়গায় প্রতিটি বিরিয়ানির হাঁড়িকে শুধুমাত্র লাল কাপড়েই মোড়া হয়।

লাল রঙ অন্যান্য রঙের থেকে বেশ উজ্জ্বল তাই নজর কাড়ে অনেক বেশী। আসলে আমাদের ভাষার মত প্রত্যেকটি রঙেরই আলাদা আলাদা ভাষা আছে। আমাদের চিন্তাভাবনাতেও প্রভাব ফেলে রঙের ব্যবহার। তবে কি পরিবেশকরা হাঁড়িতে লাল কাপড় জড়ান শুধুমাত্র বিরিয়ানি প্রেমীদের ‘সিগন্যাল’ দেবার জন্য? মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই কি তবে এই লাল কাপড় ব্যবহারের আসল কারণ? সেক্ষেত্রে, চকমকে কোনো পাত্র বা দামি কারুকাজ করা ঝলমলে কোনো কাপড়ও ব্যবহার করা যায়। কিন্তু হালিম বা বিরিয়ানির হাঁড়িতে তো শুধু লাল থান কাপড়ই জড়ানো হয়। ত্তাহলে?

               প্রত্যেকটি রঙের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ রয়েছে। দেশ বিশেষে আবার এই রঙ ব্যবহারের অর্থগুলি বদলে যায়। বেশির ভাগ ইসলামী দেশগুলি লাল রঙকে শৌর্যের প্রতীক হিসেবে ভাবতে ভালোবাসে। আর বিরিয়ানি তো মোঘলাই খানা। এছাড়া, আমাদের হৃদয়ের রং তো লাল তাই আনন্দ উৎসবে কাউকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে, সৌভাগ্য বা ভালোবাসার আবেগের প্রতীক হিসেবে হৃদয়ের এই লাল রঙকে ব্যবহার করতেই ভালবাসি, তাই না? তাই তো কোনো অ্যাওয়ার্ড ফাংশানেও বিছানো হয় ‘রেড কার্পেট’। বিরিয়ানির হাঁড়ির ক্ষেত্রেও রয়েছে এই রকমই এক শৌর্যের ইতিহাস। 

মুঘল শাসকরা গোড়ার দিকে পারস্য সংস্কৃতি থেকে বেশ প্রভাবিত হয়েছিলেন। এমনকি, তাদের জীবনধারাতেও বেশ কিছু পারস্য রীতিনীতি অনুকরণ করে চলতেন। এই ধারার পথ প্রদর্শক ছিলেন সম্রাট হুমায়ুন। পারস্যদের অনুকরণ করে তিনি মোঘল দরবারে খাদ্য পরিবেশনের বেশ কিছু রীতি চালু করেন। সাধারণত, রূপোলি পাত্রে যে খাবার রাখা হত তা লাল কাপড় দিয়ে মোড়ানো হত আর চিনামাটির পাত্র সাদা কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে সেগুলিকে ঢেকে নবাবের খাবার জায়গায় আনা হত।

মুঘলদের হাত ধরেই বিরিয়ানি প্রথম ভারতে প্রবেশ করে। সে সময় খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে, লখনৌ নবাব দরবারে আভিজাত্য ও বোনেদিয়ানা প্রকাশের জন্য খাবার রাখার পাত্রে লাল কাপড় জড়ানোর প্রচলন ছিল। যে প্রথা এখনো চলে আসছে হালিম বা বিরিয়ানির মত মোঘলাই খানা রাখার পাত্রে কাপড় জড়িয়ে রাখার মাধ্যমে। তাই, কম বেশী মশলাপাতির ব্যবহার করে আমরা যতোই নিজের স্টাইলে বিরিয়ানি বানাই না কেন, লাল কাপড়ের এই মোঘল ছোঁয়াটুকু না হয় থেকে যাক যুগ যুগান্তর ধরে।  

Related posts